রায়হান এবার ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে HSC তে গোল্ডেন A+ পেয়েছে। এখন তার স্বপ্ন—উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়া। কিন্তু হঠাৎই মনে পড়ে, বিদেশ যেতে হলে তো আগে পাসপোর্ট লাগবে! সাথে সাথেই তার মাথায় আসে —পাসপোর্ট করতে যাওয়া মানেই তো দালাল, ঘুষ, হয়রানি আর লম্বা ঝামেলা। এমন ভাবতে ভাবতেই সে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা প্রায় বাদ দিতেই চলেছিল।
এরমধ্যেই একদিন সে ল্যাপটপ খুলে কাজ করছিল। এবং কি মনে করে যেন গুগলে পাসপোর্ট লিখে সার্চ করতেই জানতে পারে—এখন ২০২৫ সাল, এখন পাসপোর্ট বানানো খুবই সহজ! কারন ঘরে বসেই ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা যায়, কোন দালাল বা ঘুষ ইত্যাদি কোন কিছুই দরকার পড়ে না।

এই নতুন আশায় রায়হান নিজেই ঘরে বসে শুরু করলো ই-পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া।
চলুন, আজ রায়হানের অভিজ্ঞতা থেকেই জেনে নিই – ২০২৫ সালে ই-পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে, কী কী কাগজপত্র লাগে, আর আবেদন কিভাবে করব?
ই-পাসপোর্ট কি?
ই-পাসপোর্ট হলো এমন এক ধরনের পাসপোর্ট যেখানে একটি ইলেকট্রনিক চিপ লাগানো থাকে। আর এই চিপে যে ব্যাক্তির পাসপোর্ট তার ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, বায়োমেট্রিক ডেটা ইত্যাদি সুরক্ষিত থাকে। আর ২০২০ সাল থেকেই বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট সুবিধা চালু করেছে।
পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে? (২০২৫)
রায়হান প্রথমেই জানলো, পাসপোর্ট করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লাগবে যা নিচে উল্লেখ করা হল:
- আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- জন্ম সনদ (১৮ বছরের নিচে হলে)
- নাগরিক সনদ (স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান/সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর)
- পিতা-মাতা বা স্বামীর/স্ত্রীর NID (পারিবারিক সম্পর্ক প্রমাণের জন্য)
- বৈবাহিক সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ (যেমন বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট) এর যেকোনো একটি
- অনলাইনে পূরণকৃত আবেদন ফরম (e-passport.gov.bd থেকে)
পাসপোর্ট আবেদন ফরম ২০২৫ – কোথায় পাবেন?
পাসপোর্ট আবেদন ফরম পাওয়ার জন্য আপনাকে প্রথমে www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর এই ওয়েবসাইটে লগইন করে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন ফরম পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপএ স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে। আবেদন ফরম লিংক।
ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম ও ধাপসমূহ (স্টেপ বাই স্টেপ)
ই-পাসপোর্ট করার প্রতিটা ধাপ এখানে স্টেপ বাই স্টেপ দেয়া হল যাতে আপনি খুব সহজে এখানে রেজিস্ট্রেশন করে একাউন্ট তৈরী করতে পারেন। এবং ই পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন।

- প্রথমে www.epassport.gov.bd এই ওয়েবসাইটে যেতে হবে। এবং এখানে Apply Online For E-Passport/Re issue বাটনে ক্লিক করুন।
- এরপর আপনাকে বাংলাদেশি সিলেক্ট করে। আপনি কোন জেলা থেকে আবেদন করতে চান এবং এরপর সঠিক বাকি ঠিকানা সিলেক্ট করতে হবে।
- তারপর যখন আপনার সামনে একটা নিচের মত আবেদন ফরম আসবে তা সঠিক তথ্য দিয়ে পূরন করতে হবে।

- রেজিস্ট্রেশন ফরমে সঠিক তথ্য দিয়ে সাবমিট করলেই আপনার রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ন হবে। এবং ফরম পূরন করার সময় যে মেইল তা দিয়েছিলেন সেই মেইল একউন্ট থেকে মেইল ভেরিফেকিশন কম্পিলিট করতে হবে।
- এবার আপনি পাসপোর্ট আবেদন করার একটা সম্পূর্ন আবেদন ফরম পাবেন। সেখানে সঠিক তথ্য এবং উপযুক্ত কাগজপএ স্কান করে আপলোড করে সাবমিট করে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এবং সোনালী ব্যাংক বা অনলাইন থেকে পেমেন্ট করে তা পরিশোধ করতে হবে।
- তারপর আপনার সুবিধা মত অফিস সিলেক্ট করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে মানে অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন আপনাকে সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে।
- তবে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে কাগজপএ জমা দেয়ার আগে আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেভাবে সাজাবেন।
- Bank Challan (মূল কপি)
- Print Summary (অনলাইনে আবেদন শেষে ডাউনলোড করা সারাংশ)
- Application Form (অনলাইনে পূরণকৃত আবেদন ফর্ম)
- NID অথবা জন্ম সনদের ফটোকপি
- Utility Bill (বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানি) ফটোকপি – ঠিকানা প্রমাণের জন্য
- Job ID / NOC / Student ID ফটোকপি (যা প্রযোজ্য)
- নাগরিক সনদের ফটোকপি
- Old Passport ফটোকপি (যদি আগে পাসপোর্ট থেকে থাকে)
- পিতামাতা বা অভিভাবকের NID ফটোকপি
- বৈবাহিক সনদের ফটোকপি (বিবাহিতদের জন্য)
- সব কাগজপএ ঠিক থাকলে পাসপোর্ট অফিসে জমা দেয়ার পর ওই দিনই আপনার পাসপোর্ট অফিসে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, সাক্ষর ও ছবি যাচাই হবে। এরপর আপনাকে পাসপোর্ট অফিস থেকে একটা স্লিপ দেয়া হবে যা আপনাকে বাসায় যত্ন সহকারে রাখতে হবে। কারন পাসপোর্ট অনতে গেলে সেই স্লিপ টা দরকার হবে।
- সর্বশেষ আপনার পাসেপোর্ট রেডি হলে আপনাকে এসএমএস এর মাধ্যেমে জানিয়ে দেয়া হবে। এবং আপনি ওই স্লিপটি দিয়ে পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারবেন।
ই-পাসপোর্ট করার খরচ (২০২৫)
এখন জানবো বিভিন্ন মেয়াদী এবং কত পৃষ্ঠার পাসপোর্ট করতে কত খরচ? নিচে ৫ বছর এবং ১০ বছর মেয়াদী ৪৮ এবং ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট করার সাধারন, জরুরী, এবং অতি জরুরী পাসপোর্ট করতে কত খরচ হবে তার একটা হিসেব দেয়া হল:
মেয়াদ | পৃষ্ঠা সংখ্যা | ডেলিভারি টাইপ | ফি (BDT) |
---|---|---|---|
৫ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | সাধারণ (২১ দিন) | ৪,০২৫ টাকা |
৫ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | জরুরি (৭-১০ দিন) | ৬,৩২৫ টাকা |
৫ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | অতি-জরুরি (২-৩ দিন) | ৮,৬২৫ টাকা |
১০ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | সাধারণ | ৫,৭৫০ টাকা |
১০ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | জরুরি | ৮,০৫০ টাকা |
১০ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | অতি-জরুরি | ১০,৩৫০ টাকা |
১০ বছর | ৬৪ পৃষ্ঠা | সাধারণ (Normal) | ৬,৯০০ টাকা |
১০ বছর | ৬৪ পৃষ্ঠা | জরুরি (Express) | ৯,২০০ টাকা |
১০ বছর | ৬৪ পৃষ্ঠা | অতি-জরুরি (Super Express) | ১১,৫০০ টাকা |
📝 মনে রাখবেন, পাসপোর্ট ফি নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের ডেলিভারির সময় বেছে নিচ্ছেন তার ওপর।
সাধারনত অতি জরুরী যে পাসপোর্ট গুলো থাকে তা 2-3 দিনের ভিতরেই পাওয়া যায়। আর জরুরী গুলো ৭-১০ দিন সময় লাগে। এবং সাধারন পাসপোর্ট পেতে ২১ থেকে কখনো ১মাসও সময় লেগে যায়।
🔹 ৫ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে?
সাধারণ ডেলিভারিতে(Normal) ৪,০২৫ টাকা, অতি-জরুরিতে(Super Express) ৮,৬২৫ টাকা লাগে।
🔹 ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে?
সাধারণ ডেলিভারিতে(Normal) ৫,৭৫০ টাকা, অতি-জরুরিতে(Super Express) ১০,৩৫০ টাকা।
উপসংহার
পাসপোর্ট বানানো এখন আর কঠিন কিছু নয়। আপনি চাইলে নিজেই পাসপোর্ট এর জন্য ঘরে বসেই আবেদন করতে পারবেন। আর যদি পাসপোর্ট সংক্রন্ত অন্য কোন তথ্য জানতে চান নিচে অবশ্যই কমেন্ট করুন।
✍️ লেখক: পিযুষ বালা | টেকব্লগ: Techrips.com
📅 সর্বশেষ আপডেট: আগস্ট ২০২৫